বিপিসির জ্বালানি তেলের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
বিপিসির জ্বালানি তেলের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
২০১৬-০৪-১১ ০৪:১৫:২৬
প্রিন্টঅ-অ+


আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি করেও মান ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির জ্বালানি তেলের মান নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছে সেনাবাহিনী। নিম্নমানের এ জ্বালানি তেল ব্যবহারের কারণে বেশকিছু গাড়ি নষ্ট হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে তারা।

বিষয়টি জানিয়ে সম্প্রতি বিপিসিকে চিঠি দিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর কিউএমজি শাখা থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে ইউরো-১ ও ইউরো-২ গ্রেডের যে জ্বালানি তেল ব্যবহার হচ্ছে, সেনাবাহিনী ব্যবহূত মিত্সুবিশি পাজেরো কিংবা হুন্দাই ব্র্যান্ডের গাড়ির সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা সত্ত্বেও বিপিসির তিন সহযোগী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির সরবরাহ করা জ্বালানি ব্যবহারের ফলে সেনাবাহিনীর বেশকিছু গাড়ি ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছে।

সেনাবাহিনীর পাঠানো ওই চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বিপিসির অধীন কোম্পানিগুলো তৃতীয় পক্ষ থেকে ভাড়ার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ করলেও খুব কম সংখ্যক ভাড়াটেই এসব ট্যাংক লরিতে একই গ্রেডের পিওএল (পেট্রোলিয়াম, অয়েল অ্যান্ড লুব্রিক্যান্টস) সামগ্রী বহন করে। অথবা এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডের পিওএল সামগ্রী নেয়ার আগে যথাযথভাবে ট্যাংক লরি পরিষ্কার করে। ফলে এসব ট্যাংক লরিতে বিভিন্ন ধরনের অপদ্রব্য জমে থাকে। এমনকি অল্প পরিমাণে হলেও এক গ্রেডের সঙ্গে অন্য গ্রেডের পিওএল সামগ্রী মিশ্রিত হয়ে পড়ে।

বিভিন্ন সাপ্লাই ডিপোর সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিন পরিদর্শন করে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, বিপিসির অধীন সাব-ডিপো থেকে সেনাবাহিনীর সাপ্লাই ডিপোয় পিওএল পরিবহনের সময় ওইসব পিওএল সামগ্রীতে বিভিন্ন ধরনের কম দামি তরল পদার্থ বা পিওএল মিশ্রণ করা হতে পারে। এসব পিওএল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহার হয়। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ পিওএল সামগ্রী সরবরাহের ফলে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিসির সুনামও এতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি রিফাইনারি থেকে সংগ্রহ করা জ্বালানির মান ইউরো-১ কিংবা ইউরো-২ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু বিপিসি আমদানিকৃত জ্বালানির সঙ্গে মিশ্রণ করে মান ধরে রাখার চেষ্টা করে তারা। সেনাবাহিনীর কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিম্নমানের জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রশ্নই আসে না। সেনাবাহিনী গ্রেড-৩ মানের জ্বালানি আমদানির অনুরোধ করেছে। বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে।

বিপিসির একাধিক সূত্র জানায়, বিপণন কোম্পানিগুলোর ব্যবহূত ট্যাংক লরি পরিষ্কার করার পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন জ্বালানি সরবরাহের সময় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি সাব-ডিপো থেকে প্রস্থানের আগে লরি বা ট্যাংকার সিল করার কথাও বলা হয়েছে। পরবর্তীতে সাপ্লাই ডিপোয় পৌঁছানোর পর অধিনায়ক কর্তৃক সিল অবমুক্ত করা হবে।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি অস্বীকার করেন যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাকসুদুর রহমান। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি ডিপোয় উপস্থিত থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করেন। ফলে এসব তেলের মান খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে গ্রেড-৩ মানের জ্বালানি ব্যবহারের জন্য তৈরি যানবাহনে দেশে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল ব্যবহারের ফলে তা নষ্ট হতে পারে।

পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে জ্বালানি তেল বিপণন করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপিসি। নিজস্ব পরিবহন না থাকায় তৃতীয় পক্ষ থেকে ভাড়া নিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে কোম্পানিগুলো।

সূত্রমতে, দেশে বেসরকারি খাতে কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট রয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে বিপিসির। একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়াধীন থাকলেও দুটি প্রতিষ্ঠান এখনো চুক্তি করেনি। চুক্তি অনুযায়ী, দেশের গ্যাসফিল্ড থেকে সংগৃহীত কনডেনসেট লিটারপ্রতি ৩৯ টাকা দরে ক্রয় করে রিফাইনারিগুলো। এর পর তা পরিশোধনের মাধ্যমে বিপিসির কাছে বিক্রি করার কথা। কিন্তু তা না করে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে রিফাইনারিগুলোর বিরুদ্ধে। এতে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে ব্যবহূত যানবাহনের ইকোনমিক লাইফটাইমও কমে যাচ্ছে।

বিপিসির তথ্যমতে, সর্বশেষ অর্থবছরে ৫৩ লাখ ২১ হাজার ৪২৯ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ৩৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬১ টন ডিজেল, ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮২৩ টন পেট্রল, ১ লাখ ২৬ হাজার ১১৪ টন অকটেন ও ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৯ টন কেরোসিন। দেশীয় রিফাইনারি থেকে বছরে প্রায় দুই লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহের পর বিপণন করে বিপিসি।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও এখনো উচ্চমূল্যে তা বিক্রি করছে বিপিসি। এতে বড় অঙ্কের মুনাফা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। এর আগে সংসদীয় কমিটিতে জ্বালানি তেলে মুনাফার যে হিসাব বিপিসি তুলে ধরে তাতে দেখা যায়, বর্তমানে ডিজেলের ক্রয়মূল্য ৪০ টাকা ১৬ পয়সা ও বিক্রয়মূল্য ৬৮ টাকা। এতে ডিজেল থেকে বিপিসি মুনাফা করছে ২৭ টাকা ৮৪ পয়সা। কেরোসিনে এ মুনাফা ২৭ টাকা ৩৯ পয়সা।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর