পৃষ্ঠপোষকতা ও গবেষণার অভাবে গাড়ি নির্মাণ উদ্যোগ সফল হচ্ছে না
পৃষ্ঠপোষকতা ও গবেষণার অভাবে গাড়ি নির্মাণ উদ্যোগ সফল হচ্ছে না
২০১৬-০৪-০৭ ১৪:২৮:০৪
প্রিন্টঅ-অ+


অটোমোবাইল বলতে আমরা চারচাকার ইঞ্জিন চালিত মোটরগাড়িকেই বুঝে থাকি। কিন্তু আজকের এই অটোমোবাইল রাতারাতি আবিষ্কার হয়নি। এটার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৮ শতক এর মাঝামাঝি সময়ে।১৮৫০ সালের কথা। জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল বেনজ গবেষণা করছেন কীভাবে ঘোড়ার গাড়ির ওয়াগন কে মোটর এর সাহায্যে চালানো যায়। অবশেষে অনেক পরিশ্রম করে তিনচাকার মোটরযান আবিষ্কার করেন এবং অটোমোবাইল আবিষ্কারকের খেতাব।

পৃথিবীর অনেক দেশে আজ আধুনিক অটোমোবাইল নিয়ে গবেশনা ও নির্মাণ চলছে। পাশাপাশি অনেক দেশ মোটরগাড়ি সংযোজন করে পরোক্ষভাবে মোটরযান নির্মাণ এর অংশীদারি হচ্ছে। তো বাংলাদেশ ই বা পিছিয়ে থাকবে বা কেন? ১৯৭১ সালে স্বাধীন হবার পর প্রায় ৪২ বছর ধরে মোটরযান সংযোজন করে পরোক্ষভাবে অংশীদার হচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ’ বাস,ট্রাক এর মতো ভারী যানবাহন সংযোজন ও চেসিস নির্মাণ ও ২০১১ সাল থেকে ‘মি্তসুবিশি পাজেরো’ এর মতো মাঝারি যান নির্মাণ করে আসছে। পাশপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু মোটরসাইকেল নির্মাণ ও সংযোজন কারখানা (যেমনঃ ওয়ালটন,রানার,ইনট্রাকো) গড়ে উঠেছে। উপযুক্ত গবেষণা, পৃষ্ঠপোষকতা,সরকার এর আন্তরিকটা প্রভ্রিত কারণে এইসব মোটরসাইকেল কারখানাগুলা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করছে।

উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও গবেষণার অভাবে গত চার দশক ধরে অনেকের গাড়ি নির্মাণ এর উদ্যোগ সফল হয়নি। কিন্তু একক প্রচেষ্টায় সফল একজন এর নাম ই ঘুরেফিরে আসছে। তিনি হলেন লিপু নিজামুদ্দিন আউলিয়া।১৯৮৯ সাল থেকে আপন ছোটভাই কে নিয়ে শুরু করা লিপু আজ একজন পরিণত গাড়ি নির্মাতা। জমকালো গাড়ি নির্মাণ, পড়াশোনা, গবেষণা করে দেশে ও বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। স্থানীয় প্রযুক্তি, সরঞ্জাম, হাতের কাজ প্রভৃতির মাধ্যমে কীভাবে একটি জরাজীর্ণ গাড়ি থেকে লাম্বরগিনি, পাগানি, কয়েংসাং এর মত সুপারকার নির্মাণ করা যায়, তা তিনি সারা বিশ্বকে দেখিয়েছেন। একসময় হলিউড এ লিমুজিন গাড়িও তিনি ডিজাইন করতেন বলে শুনা যায়।বর্তমান এ তিনি যুক্তরাজ্যে একজন সৌখিন অটোমেকার কে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘LD MOTORCRAFT’ নামক একটি গাড়ি নির্মাণ এর ওয়ার্কশপ। এছাড়া দেশে বিদেশে তার গাড়ি MODIFICATION ও COSTUME CAR বানানো রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে ।



লিপু ছাড়াও আর অনেক এ গাড়ি নিয়ে তাক লাগানো গবেষণা করছেন। সংক্ষেপে তাদের গবেষণা গুলো তুলে ধরা হলঃ



চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সিটিউট এর অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এর ছাত্র হাফেয মোঃ নুরুজ্জামান বায়ুচালিত মোটরসাইকেল যা কিনা হাইড্রলিক মেকানিজম সংযুক্ত গিয়ার বক্স প্রযুক্তিতে সিলিন্ডার এ বাতাস চালনার মাধ্যমে চলে। ২০১১ শাল থেকে কাঠ,লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম দিয়া তৈরি যানটিতে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হলেও বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করতে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে নুরুজ্জামানের দাবী।

চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপারা এলাকার ‘জেবি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ এর প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল ২০০৮ সালে আবিস্কার করেন ‘কমপ্রেসড ওয়াটার’ প্রযুক্তি,যাতে ৮০-৯০% পানির সাথে ১০-২০% জ্বালানী ব্যাবহার করা হয়। এর মূলসূত্র হল পানি থেকে অক্সিজেন বের করে হাইড্রোজেন কে জ্বালানি হিসেবে ব্যাবহার করা। হাইড্রোজেন কে জ্বালানি হিসেবে তখন ই ব্যাবহার করা যাবে যখন ইঞ্জিন জ্বালানির সাহায্যে স্টার্ট নিবে।১০,০০০ টাকা খরচে ব্যাবহার করা এই প্রযুক্তিতে গাড়ি ১ লিটার জ্বালানিতে সর্বোচ্চ ৫০ কিঃমিঃ যাবে বলে তার দাবি।



ঢাকার ইস্টওয়েসট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ইভান এর কথা না বললেই নয়। একটা জীর্ণশীর্ণ MITSHUBISHI GALLENT কে MODIFICATION করে তার রূপ আমূলে পাল্টে দেয়া আর আধুনিক GIZMA GAZZET এ ভরিয়ে দেয়া – এভাবেই শুরু হয় ইভানের MODIFICATION এর কাজ। এরপর মোটরসাইকেল এও MODIFICATION এর কাজ।



বুয়েট এর ৫ জন ম্যাকানিকাল বিভাগ এর শিক্ষার্থীর ‘নাঈপটা ৮’ প্রযুক্তিটির কথা সবার মনে থাকার কথা। বুয়েট ও জাইকা আয়োজিত ‘ইকোরান বাংলাদেশ ২০১৩’ প্রতিযোগিতায় রুয়েট,চুয়েট,কুয়েট,এমআইএসটি ও আইইইউটি সহ মোট ১৮ টি দলের মধ্যে ‘নাঈপটা ৮’ অর্জন করে সেরা পুরস্কার। এরা হলেনঃনাহিয়ান বিন হোসেন,ইয়াসিন আলী,তাউসিফ আহমদ,বখতিয়ার উদ্দিন ও শরফ শাহ্রুল হক। তাদের বানানো গাড়িতে ৪ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ বসতে পারবে আর গাড়িতে ব্যাবহার করা হবে মোটরসাইকেল এর ইঞ্জিন। এর ফলে গাড়ির জালানি খরচ কম হবে আর পাশাপাশি নামীদামী ব্র্যান্ড এর গাড়িগুলার তুলনায় দ্রুত গতিতে ছুটতে পারবে।আর গাড়ির বডি বানাতে ব্যাবহার করা হয়েছে ইস্টেইনলেস স্ষ্টীল এর ফাঁপা পাইপ আর চেসিস তৈরীতে ব্যাবহার করা হয়েছে গ্যালভানাইসিং মাইল্ড স্ষ্টীল। এইসব উপাদান আমাদের দেশ এ স্বল্পমূল্যে পাওয়া জায় তাই গাড়ি বানাতে খরচ কম হবে। প্রায় দেড় মাস যাবত ল্যাব এ তারা এঈ গাড়িটা বানাই। পাশাপাশি শিক্ষকেরা তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। বর্তমানে তারা সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করছেন যাতে তাদের এই প্রজেক্ট বাস্তবে রূপ নেয়।



ফরিদপুর এর ইমরান এ বা কম কিসে?? ৩৭ বছর বয়সী ইমরান এক সময় ফার্নিচার ব্যবসা করতেন। অসুস্থতার জন্য ৭ বছর আগে ফার্নিচার ব্যবসা ছেড়ে দেন। কিন্তু তার ধ্যানধারণা চলে যায় গবেষণার দিকে। দরিদ্রতার কারণে ইস্কুল এর গণ্ডী পেরুতে না পারা ইমরান প্রথমে বানান ব্যাটারি চালিত বেবী কার যা কিনা রিমোট দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। ব্রাক এর মাধ্যমে আমেরিকার একটি কোম্পানি তার কাছ থেকে ৩০ টি গাড়ী চায়। কিন্তু অর্থাভাবে তিনি তা বানাতে পারেননি।আবিষ্কার এর স্বপ্নে বিভোর ইমরান একে একে আবিষ্কার করেন বিদ্যুৎ ছাড়া ডীম ফুটানো মেশিন,হস্তচালিত পানির পাম্প।২০১০ সালে ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা দিয়ে তৈরি করেন তার স্বপ্নের বোট অ্যান্ড কার; যেটি পানি ও রাস্তা- এই দুই জায়গাতেই চলবে। এতে আছে একটি স্বয়ংক্রিয় মাছ ধরার মেশিন,টিভী,ভিসিডী,আরও আছে রেডিও সিগন্যাল সিস্টেম ,যাতে যানটি পানিতে ডুবে গেলে ১ মিনিট এর মধ্যে শনাক্ত করা যাবে ও টেনে তোলা যাবে। শ্যালো ইঞ্জিন চালিত এই বাহনে আধুনিক ইঞ্জিন লাগালে আরও ভালো ভাবে চলবে বলে তার বিশ্বাস।এই গাড়ির সামনের অংশ বিমানের আদলে তৈরি। প্রায় ১৫ জন যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা সম্পন্ন এই যানটি ২০১১ সালে রাস্তায় নামার কথা থাকলেও আর্থিক দুরাবস্থা আর উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা নামানো সম্ভব হয়নি।

(জুনাইদ রহমান)

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর