ওয়েস্ট ইন্ডিজের শ্বাসরুদ্ধকর জয়
ওয়েস্ট ইন্ডিজের শ্বাসরুদ্ধকর জয়
২০১৬-০৪-০৪ ১৪:০৭:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+


ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৬ বলে ১৯ রান। ব্যাটসম্যান তখন ব্রাথওয়েট। বোলার বেন স্টোকস। হাফ ভলি দিলেন, ব্যাট চালালেন ব্রাথওয়েট। ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ গিয়ে ছয়! দ্বিতীয় বল লং অন দিয়ে উড়ে গ্যালারিতে। চার বলে সাত চাই। অপেক্ষায় অধীর সবাই! তৃতীয় বল করলেন স্টোকস। এবার লং অফ দিয়ে বল উড়ে গ্যালারিতে। রান সমান দুই দলের। মাথা নিচু করে যেন হার মেনে নিলেন স্টোকস। শেষ বলটিতে বড় শটের দরকার ছিল না। তারপরও শেষ বলটি ডিপ মিড উইকেট দিয়ে উড়ে যায় গ্যালারিতে। ২ বল বাকি থাকতেই উঠে গেল ১৯ রানের জায়গায় ২৪ রান। অক্ষত চার উইকেট। দ্বিতীয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০১২তে তারা প্রথম শিরোপা জিতেছিল শ্রীলঙ্কার কলম্বো থেকে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে। ভিন্ন দল, ভিন্ন মাঠ, সময়ের ব্যবধান চার বছর। কিন্তু ম্যাচসেরা সেই একজনই। মারলন স্যামুয়েলস। পুরো টুর্নামেন্টে ফিফটি নেই। ফাইনালে জ্বলে উঠলেন আপন মহিমায়। ৩৫ বছর বয়সী স্যামুয়েলস কুমার সাঙ্গাকারার পর দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ফাইনালে দুবার ফিফটি করলেন। সেবার আউট হলেও এবার অপরাজিত। ম্যাচসেরা দুবারই। ব্রাথওয়েট ১০ বলে ৩৪ রান আর তিনটি উইকেট নিলেও খেলাটাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টিকিয়ে রেখেছিলেন স্যামুয়েলস তার হিসেবি ব্যাটিং দিয়েই। তার এ ৮৫ রানই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের সর্বোচ্চ। তখনই শুরু হয়ে গেল ক্যাবিবীয়দের চ্যাম্পিয়ান ড্যান্স। ডোইয়েন ব্রাভোর সুর করা ও লেখা গানটি এখন ক্যারিবীয় ক্রিকেট দলের থিম সং ও ড্যান্স। ক্যারিবীয় সাগরে আছড়ে পড়েছে যুগল ট্রফি জয়ের আনন্দ। নজিরবিহীনভাবে একই দিনে ছেলে ও মেয়েদের দুটি শিরোপাই গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘরে। এর আগে অনূর্ধ ১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ই বলে দেয় ক্যারিবীয় ক্রিকেটের নতুন সূর্য উদিত হয়েছে। এবার কেবল ঘরের ঝামেলা মিটিয়ে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। শেষ পর্যন্ত উপভোগ্য ফাইনাল উপহার দেয়ার জন্য অভিনন্দন পেতে পারে ইংল্যান্ড। তবে দুর্ভাগ্য তাদের, আরও একবার তীরে এসে তরী ডুবলো তাদের। ৩৭ বছর আগে ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নেয়া হলো না ইংল্যান্ডের। সেই সঙ্গে ইডেনের মাঠে যুক্ত হল ১৯৮৭ পর আরেকটি ফাইনাল হারের দুঃখ গাথা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ২০১২ সালে চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল ক্যারিবীয়রা। ঠিক দুই বছর পর আবারও ক্রিকেটের ছোট ফরমেটে রাজ মুকুট ছিনিয়ে নিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ইডেন গার্ডেন্সে ইংল্যান্ডের ১৫৫ রানের জবাবে ওয়েস্ট ৬ উইকেট হারিয়ে ১৬১ রান। চারটি ছয় ও ১ চারের মারে ১০ বলে অপরাজিত ৩৪ রান করে জয়ের নায়ক ব্রাথওয়েট। ফাইনালে উঠতে না পারলেও আসরের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন ভারতের রিবাট কোহলি তার অসাধারণ কয়েকটি ইনিংসের জন্য। তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহন করেন সৌরভ গাঙ্গুলি। আর স্যামিদের হাতে ট্রফিটা তুলে দেন আইসিসি প্রেসিডেন্ট জহির আব্বাস। গত বছর যেটা দিতে পারতেন বাংলাদেশের আ হ ম মুস্তাফা কামাল যিনি তখন ছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তখনকার চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন নিজে পুরস্কার তুলে দেন চ্যাম্পিয়নের হাতে।
ফাইনালে হতাশ করেনি কলকাতার দর্শকরা। ভারত না থাকলেও গ্যালারি মাতিয়েছেন চার ছয়ের তালে তালে। দর্শকদেরও হতাশ করেনি আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা দুই দলও। প্রায় ৬০ হাজার ধারণ ক্ষমতার ইডেন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সেমিফাইনালে ভারতের ১৯২ রান তাড়া করতে নেমে গেইলকে হারিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গতকাল ইংল্যান্ডের ছুড়ে দেয়া ১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ফাইনালেও ব্যর্থ। সেই ম্যাচে ১.১ ওভারে বোল্ড হয়েছিলেন ৫ রান করে। এই ম্যাচে ক্যাচ দিলেন কিন্তু করলেন একটি রান কম করে। কিন্তু এবার গেইলের সঙ্গে ব্যর্থ আগের ম্যাচে ৫২ রান করা ওপেনার চার্লস জনসনও। এরপর আরও বড় ধাক্কা অপরাজিত ৮২ রান করে দলকে ফাইনালে তোলা লেন্ডল সিমন্সও। আশার প্রতীক হয়ে নামলেও শুন্য রানে বিদায় উইলির বরে লেগবিফোর উইকেট আউট হয়ে। মাত্র ১১ রানে তিন উইকেটের পতন। এমন ব্যাটিংয়ে ইংলিশদের প্রতিশোধের মিশনটা যেন সফল হওয়ার সংকেত দিচ্ছিল। ব্যাট হাতে দারুণ লড়াই করা রুট বল হাতে প্রথম দুটি উইকেট নিয়ে ইংলিশদের স্বপ্ন উজ্জ্বল রাখেন। কিন্তু আগের ম্যাচে আট রানে আউট হওয়া স্যামুয়েলস ছিলেন আড়ালে। প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি সংযমী হয়ে। চতুর্থ উইকেটে ব্রাভোকে নিয়ে গড়ে তোলেন ৭৫ রানের জুটি। ২৫ রান করা ব্রাভোকে আদিল রাশিদ ফেরান রুটের ক্যাচ বানিয়ে। ৮৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়েও হাল ছাড়েনি ক্যারিবীয়রা। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ছিল ১০৭ রান। এরপর আন্দ্রে রাসেল আর অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি উইলির এক ওভারে আউট হলে আবার আশার আলো দেখতে শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। স্বপ্নপূরণের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেন ক্রিস জর্ডান। দারুণ বল করে ১৯তম ওভারে আট রান দিলে ৬ বলে ১৯ রানের টার্গেট অসম্ভবই মনে হচ্ছিল।

সন্ধ্যায় মাঠে নামার আগে গেইলরা ক্যারিবীয় নারীদের চ্যাম্পিয়ান ড্যান্সে সামিল হন। একটি কাপ ঘরে উঠেছে আরেকটি কাপের অপেক্ষা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টসে জয় দিয়েই শুরু। বিশ্বকাপে আগের ৫ ম্যাচের মতো ফাইনালেও টসে জিতে ড্যারেন স্যামি বেছে নেন পছন্দের রান তাড়া করা। টানা ১০ টি-টোয়েন্টিতে তিনি জিতলেন টস। শুরুতে চমক স্পিন আক্রমণ দিয়ে। নতুন বলে স্যামুয়েল বদ্রির স্পিন ভিত নাড়িয়ে দেয় ইংলিশ ব্যাটিং লাইন আপের। প্রতিরোধ গড়ে তোলেন একাই জো রুট। ইংলিশদের সেমিফাইনালের নায়ক জেসন রয় ফাইনালে ব্যর্থ। প্রথম বলে বেঁচে গিয়েছিলেন জোড়ালো এলবিডব্লিউ আবেদন থেকে। তবে পরের বলেই বদ্রির দারুণ এক স্লাইডারে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হয়ে সাজঘরের পথ ধরেন। পরের ওভারে আবারও বদ্রি। আন্দ্রে রাসেলের লেগ স্টাম্পে থাকা বলে টাইমিং দারুণ করেছিলেন অ্যালেক্স হেলস। কিন্তু শট ফাইন লেগে বদ্রিকে ফাঁকি দিতে পারেননি। জায়গায় দাঁড়িয়েই ক্যাচ নেন তিনি। তৃতীয় উইকেটেও যথারীতি ছিলেন বদ্রি। এবার দারুণ এক গুগলিতে বিভ্রান্ত ইংলিশ অধিনায়ক মরগান। ১৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন খেই হারিয়ে ফেলে ইংলিশরা। তবে আক্রমণ চালানো শুরু করেন রুট আর জস বাটলার। এ দুজনই ইংলিশদের পক্ষে চলতি আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী। তাদের দু’জনের শিকার হন সুলেমান বেন। এই বাঁহাতি স্পিনারের টানা দু বল গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেন বাটলার। কিন্তু বিপজ্জনক হয়ে ওঠা ৫১ রানের এই জুটি ভাঙেন কার্লোস ব্রাথওয়েট। চতুর্থ ছক্কার চেষ্টায় আউট হন বাটলার ২২ বলে ৩৬ রান করে। সেই সঙ্গে ভাঙ্গে চতুর্থ উইকেটে করা ৬১ রানের জুটি।

বাটলার আউট হলেও একপাশ আগলে রেখে ৩৩ বলে ফিফটি তুলে নেন রুট। কিন্তু সেখান থেকে আবারও হঠাৎই এলোমেলো ইংল্যান্ড। এক ওভারেই ডোয়াইন ব্রাভো ফেরান স্টোকস ও মঈন আলিকে। ব্র্যাথওয়েটকে স্কুপ করতে গিয়ে আনাড়ির মতো উইকেট উপহার দিয়ে আসেন ৩৬ বলে ৫৪ রান করা রুট। মাত্র ৪ বলের মধ্যে ১ রানে ইংল্যান্ড হারায় ৩ উইকেট। ব্রাভোকেই পরে এক ওভারে দুটি ছক্কা মারেন ডেভিড উইলি। তার ১৩ বলে ২১ রান প্রাণ ফেরায় ইংলিশ ইনিংসে। ব্রাভোর বলে আবার দারুণ এক ক্যাচে বদ্রি ফেরান লিয়াম প্লাঙ্কেটকে। হাতে ব্যথা নিয়ে মাঠও ছাড়তে হয় তাকে। শেষ ওভারে ক্রিস জর্ডান দলের রানকে নিয়ে যান দেড়শ’র ওপারে। ৩৭ রানে তিন উইকেট নেন ব্রাভোও।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ক্রীড়া এর অারো খবর