ঢাকায় চারটি ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ করতে চায় সেতু বিভাগ
ঢাকায় চারটি ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ করতে চায় সেতু বিভাগ
২০১৬-০৪-০৪ ১৩:৪৭:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+


ঢাকার যানজট কমাতে চারটি ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল (সাবওয়ে) নির্মাণ করতে চায় সেতু বিভাগ। এজন্য প্রাথমিক প্রস্তাবনাও তৈরি করেছে সংস্থাটি। তবে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) সঙ্গে এগুলো সাংঘর্ষিক। আবার সাবওয়ে নির্মাণে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অনুমোদনও নেয়া হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলো নিয়ে শুরুতেই আপত্তি তুলেছে ডিটিসিএ।

প্রস্তাবনামতে, প্রথম ধাপে দুটি সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। প্রথম সাবওয়ের প্রস্তাবিত রুট হলো টঙ্গী থেকে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে মহাখালী, মগবাজার, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া পর্যন্ত। পরবর্তীতে তা নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণ হবে। দ্বিতীয় সাবওয়েটির রুট প্রস্তাব করা হয়েছে আমিন বাজার থেকে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, নিউ মার্কেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত।

দ্বিতীয় ধাপে আরো দুটি সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-১০, নেভি কলোনি, কাকলী, গুলশান-২, রামপুরা, খিলগাঁও, মতিঝিল হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত, পরবর্তীতে যা ঝিলমিল পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এটি সাবওয়ে-৩ নামে পরিচিত। চতুর্থ সাবওয়েটি হবে রামপুরা থেকে নিকেতন, তেজগাঁও, সোনারগাঁও হোটেল, পান্থপথ, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি-২৭, রায়ের বাজার, জিগাতলা, আজিমপুর, লালবাগ হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত।

প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়, সাবওয়ে-১ আরটিপিতে প্রস্তাবিত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)-৩ ও ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)-৪-এর অন্তর্ভুক্ত। এমআরটি-২-এর অংশ হলো সাবওয়ে-২। সাবওয়ে-৩ হলো এমআরটি-১ ও এমআরটি-৩-এর অংশ। আর সাবওয়ে-৪ আরএসটিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

সাবওয়েগুলোর প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরতে রোববার রাজধানীর সেতু ভবনে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। এতে আপত্তি জানান ডিটিসিএ ও সড়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা। আরএসটিপির বাইরে কোনো ধরনের প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হবে না বলেও বৈঠকে জানানো হয়।

জানতে চাইলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মো. কায়কোবাদ হোসেন বলেন, আরএসটিপি প্রণয়নে আগামী ২০ বছরের যাত্রী চাহিদা বিবেচনা করা হচ্ছে। ব্যাপকভিত্তিক সমীক্ষার মাধ্যমে বিআরটি ও এমআরটির রুটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সেগুলো বাদ দিয়ে ও ডিটিসিএর অনুমোদন ছাড়া রাজধানীতে কোনো সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাই অনুমোদন করা হবে না।

তিনি আরো বলেন, সাবওয়ের রুটগুলো ত্রুটিপূর্ণ। আরএসটিপিতে এ ধরনের কোনো প্রকল্পও নেই। এসব রুটে যাত্রী চাহিদা কেমন আছে, তাও স্পষ্ট নয়। আবার এমআরটি-১ ও ৫-এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়ে গেছে। বিআরটি-৩ নির্মাণও শুরু হয়েছে। তাই সাবওয়ে নির্মাণ আরএসটিপি বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করবে। আরএসটিপির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো প্রকল্প অনুমোদন করবে না ডিটিসিএ।

জানা গেছে, সাবওয়ে পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে মতামত তুলে ধরেন শীর্ষস্থানীয় নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ট্রাফিক চাহিদা বুঝে সাবওয়ের রুট চিন্তা করতে হবে। সবচেয়ে বেশি ট্রাফিক জেনারেট করবে, এমন পথে সাবওয়ের লাইন নিয়ে যাওয়া উচিত। এলিভেটেড (উড়াল) মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে উত্তরা থেকে শাপলা চত্বর যেমনটি চিন্তা করা হয়েছে। তাই সাবওয়ের রুট আপাতত চূড়ান্ত না করে আরো গভীর পর্যালোচনা ও সমীক্ষার ওপর জোর দেন তিনি।

জামিলুর রেজা চৌধুরী আরো বলেন, ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক উত্তর-দক্ষিণে। এজন্য পূর্ব-পশ্চিমে ট্রাফিক যোগাযোগের চিন্তা করতে হবে। এ মুহূর্তে রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজ চলছে, যা হচ্ছে এলিভেটেড। আর সাবওয়ে হবে মাটির নিচ দিয়ে। এটা আরএসটিপিতে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর ফ্যাক্টর ছিল বিপুল ব্যয় নিয়ে। আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে গেলে এলিভেটেডের চেয়ে আড়াই গুণ অর্থ লাগে। তাই প্রকল্প ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, সাবওয়ে-১-এর দৈর্ঘ্য হবে ৩২ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২৬ কোটি ডলার। সাবওয়ে-২-এর দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৭ কোটি ডলার। তবে বিস্তারিত সমীক্ষা সম্পাদনের মাধ্যমে পরবর্তীতে এগুলোর প্রকৃত ব্যয় নিরূপণ করা হবে।

সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে রাজধানীতে সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আরএসটিপির সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা আছে কিনা, তা জানতে ডিটিসিএর মতামত চাওয়া হয়েছে। এছাড়া অর্থায়ন হিসেবে জিটুজি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সবার মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সড়ক পরিবহন বিভাগ, সেতু বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সাবওয়ে নির্মাণের দায়িত্ব সেতু বিভাগকে দেয়া হয়। তবে তিন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন তিনি।

ডিটিসিএ সূত্র জানায়, গাজীপুর থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণ শুরু হয়েছে। তাই এ রুটে সাবওয়ে নির্মাণ সম্ভব নয়। আবার এমআরটি-১ প্রথম অংশ হিসেবে বিমানবন্দর সড়ক থেকে কমলাপুর ও এমআরটি-৫-এর অংশ হিসেবে বাড্ডা থেকে মিরপুর সড়ক, মিরপুর-১০, গাবতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সম্ভাব্যতা যাচাই করছে জাইকা। এগুলোর কিছু অংশ এমনিতেই আন্ডারগ্রাউন্ড হবে। তাই এ দুই রুটে সাবওয়ে নির্মাণ সম্ভব নয়। এছাড়া মগবাজারে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, শান্তিনগর থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। তাই রাজধানীর এসব অংশে চাইলেও সাবওয়ে নির্মাণ সম্ভব নয়।

জানতে চাইলে জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, অসমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের ফলে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) বাস্তবায়ন ব্যর্থ হয়। এখন এটি সংশোধন করা হচ্ছে। সমন্বয়হীনভাবে আবারো প্রকল্প নেয়া হলে আরএসটিপি বাস্তবায়ন হুমকিতে পড়বে। তাই সাবওয়ে নির্মাণের আগে বিস্তারিত সমীক্ষা ও গভীর পর্যালোচনা দরকার। তা না হলে রাজধানীর যানজট কমানো সম্ভব হবে না।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর