বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে
বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে
২০১৬-০৩-২৮ ১৬:১৮:৪১
প্রিন্টঅ-অ+


বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা প্রতিবছর এ দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এবং প্রতিবছর এ অর্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এ বিষয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) বেশ চিন্তিত এ বিষয়টি নিয়ে।

দেশে বৈধ ও অবৈধ বিদেশি কর্মরতদের সঠিক সংখ্যা সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে সূত্র বলেছে, বর্তমানে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বৈধভাবে যত বিদেশি কাজ করছেন, তার চেয়ে অবৈধের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এ সংখ্যা এক লাখও হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলেছে, যারা বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করেন, তারা উপার্জিত আয় নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন বেআইনি পথে। আইনের ভাষায়, টাকা পাচার করছেন তারা, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় দেশে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ টাকা পাচার প্রতিরোধ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা নিতেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত ১ মার্চ রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে বিদেশি নাগরিকদের কর সংগ্রহ কার্যক্রম মনিটরিং এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাদের নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধেও জরিমানা ও ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে এক বৈঠক হয়। এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কর ফাঁকিবাজ বিদেশিদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের যারা নিয়োগ দিচ্ছেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য টাস্কফোর্স এবং ডাটা ব্যাংক গঠন করবে এনবিআর। বৈঠকে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এফবিসিসিআইর প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এনবিআর বলছে, বাংলাদেশে প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্ট, মার্চেন্ডাইজিং, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি খাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শকসহ দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক কাজ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে অনেক বিদেশি কর্মী বাংলাদেশে কাজ করে কোনো কর পরিশোধ ছাড়া তাদের টাকা অবৈধভাবে নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন।

বিনিয়োগ বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়। ভ্রমণ এবং ব্যবসার ভিসা নিয়ে স্বল্প সময়ের জন্য অনেকে বাংলাদেশে আসছেন। তাদের বড় একটি অংশ কাজ শেষে ফিরছেন না। এখানেই থেকে যাচ্ছেন। তারাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে কাজ করেন। তাদের আয়ও করের আওতায় আসছে না। বিনিয়োগ বোর্ড বলেছে, বর্তমানে মাসে গড়ে ২০০ থেকে আড়াইশ ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে নতুন ১০০ থেকে ১৫০। অবশিষ্টগুলো নবায়ন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বৈধ বিদেশি কর্মীরা মাসে যে আয় করেন, তার সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ পর্যন্ত বিনা অনুমতিতে নিজ দেশে পাঠাতে পারেন। বাকি টাকা মেয়াদ শেষে দেশ ত্যাগ করার সময় একসঙ্গে নিতে পারেন।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং এনজিও ব্যুরো বিদেশিদের কাজের অনুমতি দেয়। এ ছাড়া নিরাপত্তা ইস্যুতে বাধ্যতামূলক অনুমতি লাগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। বিনিয়োগ বোর্ড সূত্র বলেছে, তারা এ পর্যন্ত ২৫ হাজার বিদেশিকে ওয়ার্ক পারমিট দিয়েছে। বেপজা এবং এনজিও ব্যুরো বলেছে, তাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশে কে আসছেন আর কে বের হচ্ছেন, তার তদারকির দায়িত্ব পুলিশের ইমিগ্রেশন বিভাগের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, অবৈধভাবে কাজ করছেন দেশের মধ্যে এমন বিদেশির সংখ্যা এক লাখের বেশি। কিন্তু তাদের প্রতি সরকারের কোনো তদারকি নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লা আল মামুন বলেন, বিদেশিদের বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অনুমতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিদেশি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে দেশের মধ্য থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক বলেন, এটা ঠিক যে, অনেক বিদেশি বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছেন, যা আইনত অপরাধ। এ বিষয়ে ব্যাপক জরিপ হওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিয়ে আসছে। কেউ চাকরির কথা বলে আসছেন, কেউ আসছেন ব্যবসা ও ভ্রমণের নামে। মেয়াদ শেষে তাদের অনেকেই দেশে ফিরে যাচ্ছেন না। তাদের খুঁজে বের করা কঠিন। স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, তবে কিছু ঘটনায় তাদের ধরা হচ্ছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিনিয়োগ বোর্ডের সদস্য অতিরিক্ত সচিব নিবাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশিদের ধরার দায়িত্ব তাদের নয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। তার মতে, আইন কঠোর করার দরকার নেই। তদারকি বাড়ালে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কমে যাবে।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চার হাজার পোশাক শিল্পের মধ্যে এক হাজার ফ্যাক্টরিতে বিদেশিরা কর্মরত আছেন। এসব ফ্যাক্টরিতে কতজন বিদেশি নিয়োজিত আছেন, তার কোনো সঠিক সংখ্যা নেই। তবে একজন পোশাক মালিক জানান, প্রতিটি বড় ও মাঝারি কারখানায় গড়ে পাঁচ থেকে ১০ জন পর্যন্ত কাজ করছেন। সাধারণত বিদেশিদের ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের বেতন গড়ে দেড় হাজার ডলার থেকে ৩ হাজার ডলার। তবে টেক্সটাইল শিল্পে বেতন মাসিক চার হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়া হয়। টেক্সটাইল শিল্পে কম-বেশি সব প্রতিষ্ঠানেই বিদেশি বিশেষজ্ঞরা চাকরি করছেন। বর্তমানে এক হাজার টেক্সটাইল শিল্প আছে। একটি সূত্র জানায়, বায়িং হাউসে যারা কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগই অবৈধ। বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাধিক বায়িং হাউস আছে।

সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা দেশে খুবই কম। বিশেষ করে প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। যারা ভালো কাজ জানেন, তারা উচ্চ বেতনে চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে যান। তাই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বেশি বেতন দিয়ে বিদেশিদের আনেন দেশীয় উদ্যোক্তারা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক রফতানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম পারভেজ চৌধুরী বলেন, পোশাক কারখানায় অবৈধ বিদেশি নেই, তা অস্বীকার করা যায় না। তবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎপর হলে এ কাজ কঠিন নয়। তিনি বলেন, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার কাজে বিদেশিরা যে রকম দক্ষ, সে তুলনায় বাংলাদেশে দক্ষ জনবল নেই। বিদেশিরা অনেক বেশি পেশাদার। প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে। সে জন্য বাধ্য হয়েই বেশি বেতন দিয়ে তাদের আনা হয়।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

অর্থনীতি এর অারো খবর