১২৫ বছর পর শুরু হচ্ছে রেলপথ নির্মাণ কাজ
১২৫ বছর পর শুরু হচ্ছে রেলপথ নির্মাণ কাজ
২০১৬-০৩-১৫ ০২:১৯:২২
প্রিন্টঅ-অ+


১৮৯০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রথম পরিকল্পনা নেয়া হয় দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণকাজের। কিন্তু প্রায় ১২৫ বছর কেটে গেলেও শুরু হয়নি সে কাজ। অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে এ রেলপথ নির্মাণের কাজ।

মুলত চট্টগ্রাম থেকে মায়ানমারের আকিয়াব বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এই রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু গত সোয়া শ বছরে কয়েক দফা উদ্যোগ নেয়া হলেও ব্যর্থ হয়।

অবশেষে ২০১০ সালে মহাজোট সরকার আবারও মায়ানমারের সঙ্গে রেলপথে যোগাযোগের জন্য পরিকল্পনা নেয়। এজন্য চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মায়ানমার সীমান্তের গুনদুম পর্যন্ত প্রায় ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

প্রকল্প গ্রহণের পরে সাড়ে ৫ বছর অতিক্রম হলেও কোন কাজই হয়নি কিন্তু বৃদ্ধি করা হয়েছে ব্যয় ও সময়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ নির্ধারণ পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

এছাড়া ২০২০ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১০ সালের জুলাইয়ে প্রথম দফা অনুমোদনের সময় রেলপথের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ও মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১৩ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৩ হাজার ২৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু তিন মাস ব্যবধানে প্রকল্পের ব্যয় আবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংস্থাটির সূত্র জানায়।

চট্টগ্রাম ও মায়ানমারের আকিয়াব বন্দরের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনের পর্যন্ত প্রায় সোয়া শ বছর আগে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি মায়ানমার। ১৮৯০ সালে মায়ানমার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম থেকে রামু ও কক্সবাজার হয়ে রেলপথ নির্মাণের জন্য সমীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮-০৯ সালে মায়ানমার রেলওয়ে সমীক্ষাও চালায়। এরপর ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম-দোহাজারী-রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত আবারও সমীক্ষা চালানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের কাজও শুরু হয়। তখন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারের মতো রেলপথ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাকি রেলপথ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত, পাকিস্তান ও মায়ানমার তিনটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রেলপথ আর হয়নি। এরপর ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সরকার একবার উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি। জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) ১৯৭১ সালে এ পথে ট্রাফিক সম্ভাবনা সমীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার উদ্যোগ নেয়া হয় প্রকল্পটি নির্মাণে। তৎকালীন সরকারের অনুরোধে ১৯৭৬-৭৭ সালে আবার সমীক্ষা করে জেআরটিএস। পরে ১৯৯২ সালে এসকাপ কমিশন অধিবেশনে তিনটি ইউরো-এশিয়া রেল নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এর একটি রুট বাংলাদেশ হয়ে মায়ানমার যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এরপর এই রুট নিয়ে আর তেমন আলোচনা করা হয়নি। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে আবারও এ রেলপথটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১০ সালে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মায়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। প্রথমে মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্পটি সংশোধন করে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সংশোধনের পর প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৩ হাজার ২৯ কোটি টাকা। মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ২০২০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রুটটি ট্রান্স-এশিয়ান ও সাসেক রেল রুটভুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ চালু করতে এ রেলপথটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। তাই জমি অধিগ্রহণসহ অন্য খরচ বিবেচনায় রেলপথটি নির্মাণে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১.৫ বিলিয়ন বা প্রায় ১২ হাজার কোটি দেয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বাকি অর্থ জিওবি ফান্ড থেকে ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে সংস্থাটির সূত্র জানায়।
এ ব্যাপারে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন বলেন, সোয়া শ বছর আগেই এ রেলপথ করার কথা ছিল। এতে বোঝা যায়, তখনো এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। এখন যেহেতু ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে মায়ানমারের আকিয়াব হয়ে তা চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাই গুরুত্ব বুঝে নতুন করে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্পটির আওতায় দোহাজারী থেকে রামু ৮৮ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিলোমিটার এবং রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কথা রয়েছে। এছাড়া সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাহ, রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও গুনদুম রেলস্টেশন নির্মাণ এবং কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলক সিগন্যালিং সিস্টেম, চারটি প্রধান ও ৪৩টি ছোট রেল সেতু এবং ১৪৪টি লেভেল ক্রসিংসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন নির্মাণকাজ করা হবে। ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ১ হাজার ৭৪১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬০ দশমিক ৩৬ একর এবং কক্সবাজার জেলায় এক হাজার ৫১ দশমিক ১৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এছাড়া রামু ও আশপাশের এলাকায় হাতির অভয়ারণ্য। ওই এলাকায় বুনোহাতি প্রায়শই দল বেঁধে চলাচল করে। অনেক সময় হাতি শুঁড় তুলেও পথ চলে। এক্ষেত্রে রেলপথ যাতে হাতির চলাচলে কোন সমস্যা সৃষ্টি না করে সেজন্য ইমব্যাঙ্কমেন্টের উচ্চতা কিছু স্থানে বাড়াতে হবে। এজন্য রেলপথে বিশেষ ধরনের সেন্সর বসাতে হবে। এতে কখনো হাতি রেলপথে থাকলে ট্রেন চালক ওই এলাকা অতিক্রমের আগেই তা বুঝতে পারে। হাতির বিষয়টি মাথায় রেখে জমির প্রয়োজন কিছুটা বাড়বে। এতে জমি অধিগ্রহণের ব্যয় কিছুটা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অনুমতি নিয়ে জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান আছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।
এ ব্যাপারে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) সাগর কৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ময়ানমার, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে একই রেলপথে যুক্ত করতে কাজ করছে এডিবি। এক্ষেত্রে মিসিং লিঙ্কগুলোতে (যেসব স্থানে রেল সংযোগ নেই) রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এর আওতায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে এডিবি অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। তাই প্রকল্পটি পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগ করে প্রক্রিয়া শেষে খুব শীঘ্রই রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

বিবিধ এর অারো খবর