পে-স্কেল জটিলতার অবসান
পে-স্কেল জটিলতার অবসান
২০১৬-০৩-০১ ০২:২৮:২৪
প্রিন্টঅ-অ+


অবশেষে অবসান হতে যাচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ প্রকৌশলী, কৃষি ও চিকিৎসক (প্রকৃচি) এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ২৬টি ক্যাডার ও ফাংশনাল কর্মকর্তাদের পে স্কেল জটিলতার । ইতিমধ্যে তাদের পাঠানো প্রস্তাব পর্যালোচনা করেছে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডের পদের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিনিয়র অধ্যাপকদের মধ্যে আটজনকে দেওয়া হতে পারে সিনিয়র সচিবের সমপর্যায়ের বেতন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশে ফেরার পর তাদের প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সরকারি একটি সূত্রে জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে প্রায় ২০টি ক্যাডারের প্রস্তাব জমা হয়েছে। তাদেরও পদোন্নতির সোপান সৃষ্টি করা হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চতর গ্রেডে পদের সংখ্যা বাড়িয়ে নিচের দিকে কমানো হচ্ছে পদের সংখ্যা। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাড়ছে মধ্যম গ্রেডের পদ। পাশাপাশি নন ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর এন্ট্রি ও ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর এন্ট্রি পদ সমান হচ্ছে। ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য অবশ্য এখনও কোনো সুখবর নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জটিলতা নিরসনের প্রস্তাব না আসায় তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসন বাদে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সোপান তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদোন্নতির বিধিমালা ও সংশিল্গষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামোতে সংশোধনী আনার চিন্তাভাবনা রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে। এর পরই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বেতন বৈষম্য ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মর্যাদায় সমতা আনার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, পে স্কেলে যেসব জটিলতা দেখা গেছে, সে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২৬টি ক্যাডারের সমস্যাগুলো সমাধানে ১৪ সপ্তাহ সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দিয়েছে। বৈষম্য বা বেতনক্রম নিয়ে পদমর্যাদার বিষয়ে ইতিমধ্যে কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়- এমন সমাধান আশা করছেন তিনি নিজেও। তিনি বলেন, সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর একটি প্রস্তাবনা রয়েছে। সেটিকে ভিত্তি ধরে কাজ চলছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অর্থমন্ত্রী দেশে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রস্তাব নিয়ে বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া ২৬টি ক্যাডারের বিষয়ে কাজ করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। যাদের প্রস্তাব এসেছে তাদের সমস্যার সমাধান আগে হবে। যাদের প্রস্তাব আসেনি তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হবে।

বেতন বৈষম্য বিলোপ করতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ৬ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে সরকারকে। অন্য সংগঠনগুলো তাদের আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। তবে আগামী মাসের মাঝামাঝি নাগাদ তারা আবারও মাঠে নামবে এমন আভাস দিয়েছে তারা।

সূত্র জানায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কতজনকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদায় বেতনক্রম ঘোষণা করা যায় সেটি নির্ধারিত হয়েছে। অন্তত পাঁচ বছর অধ্যাপকের পদে সন্তোষজনক চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হলে তাদের মধ্যে থেকে ৮ জনকে সিনিয়র সচিবের সমান বেতনক্রম দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকদের পর্যায়ক্রমিক পদোন্নতির স্বার্থে উচ্চতর গ্রেডের পদ সৃষ্টি করা হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে ২০টি ক্যাডার থেকে তারা প্রস্তাবনা পেয়েছে। বাকিগুলো বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তর থেকে কোনো প্রস্তাব তারা এখনও পায়নি। ফলে তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। শেষ পর্যন্ত এ দুটি ক্যাডারের জন্য পুরো বিষয়টি প্রলম্বিত হতে পারে- এমন আশঙ্কার কথাও শুনিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।

শিক্ষা ক্যাডারের মধ্যে সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের বিদ্যমান পদ চতুর্থ গ্রেডের। এ পদে নিয়োজিত শিক্ষকের সংখ্যা ৮৫৮ জন। এর মধ্য থেকে চাকরিকাল দুই বছরের ভিত্তিতে তৃতীয় গ্রেডে ৪০০টি পদ উন্নীত করা হচ্ছে। একইভাবে দ্বিতীয় গ্রেডে ১০টি পদ সংরক্ষণ করা হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি ছাড়াও আরও দুটি গ্রেড-১ পদ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি গ্রেড-২ পদ, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদকে গ্রেড-২ করা হতে পারে। তবে এটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শিক্ষা ক্যাডারে বিদ্যমান অষ্টম গ্রেড থেকে দ্বিতীয় গ্রেড পর্যন্ত সকল গ্রেডে পদের সংখ্যা বাড়িয়ে পদোন্নতির সোপান তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আনসার ক্যাডারের তৃতীয় থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত নতুন করে অর্ধশতাধিক পদ তৈরি করা হবে। এ ক্যাডারে অতিরিক্ত মহাপরিচালক, উপ-মহাপরিচালক, উপ-পরিচালকের পদ বাড়ানো হবে। ষষ্ঠ গ্রেড থেকে ৮টি পদ বিলুপ্ত করে সহকারী পরিচালকের (প্রবেশ পদে) ৫০টি পদ বাড়ানো হতে পারে। এতে ওপরের দিকে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। এ ছাড়া পরিচালকের বিদ্যমান ২২টি পদ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ২৫টি করা হবে। কৃষি ক্যডার ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ক্যাডারেও পর্যায়ক্রমিক গ্রেডের পদ বাড়ানো হবে যাতে নিচের দিক থেকে ওপরের দিকে পদোন্নতি দেওয়া যায়।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব: যেসব গ্রেডে ১০০ সদস্য আছেন সেসব ক্যাডারে কমপক্ষে একটি প্রথম ও একটি দ্বিতীয় গ্রেডের পদ সৃজন করা হবে। কারিগরি, সমবায়, ইকোনমিক, পরিসংখ্যান ও টেলিকমে মোট ৬টি পদ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ প্রশাসন-বহির্ভূত আলোচ্য ক্যাডারে প্রথম শ্রেণীর পদ হবে ৩৮টি। একই ভাবে আনসার, সড়ক ও জনপথ, সাধারণ শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, ডাক, গণপূর্ত ,খাদ্য ও বন ক্যাডারে একটি করে দ্বিতীয় গ্রেডের মোট ১০টি পদ সৃষ্টি করা হবে। ফলে এ গ্রেডে মোট পদের সংখ্যা ১০১টি। তবে বাণিজ্য ক্যাডারে কোনো দ্বিতীয় গ্রেডের পদ থাকবে না।

সমবায় এবং পরিসংখ্যান ক্যাডারে একটি করে তৃতীয় গ্রেডের মোট দুটি পদ সৃজন করা হবে। এর ফলে তিন শতাংশ কর্মচারী চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতির সুযোগ পাবেন। এতে প্রশাসন ক্যাডারে পঞ্চম গ্রেড থেকে ৪৫টি পদ চতুর্থ গ্রেডে আসবে। কৃষিতে ৩৬টি চতুর্থ গ্রেডের ক্যাডার পদ বহাল রয়েছে। কারিগরি শিক্ষায় চতুর্থ গ্রেডের পদ হবে ৩০টি। প্রাণিসম্পদ বিভাগে থাকছে ৪০টি চতুর্থ গ্রেডের পদ। মৎস্য ক্যাডারে ২৫টি চতুর্থ গ্রেডের পদ থাকবে। চতুর্থ গ্রেডে বর্তমান পদ সংখ্যা ২ হাজার ২৫১টি। এখন তা বেড়ে হবে ২ হাজার ৪২৭টি।

এ ছাড়াও অষ্টম গ্রেডে ৩ বছর, সপ্তম গ্রেডে ৪ বছর, ষষ্ঠ গ্রেডে ৫ বছর, পঞ্চম গ্রেডে ১০ বছর, চতুর্থ গ্রেডে ১২ বছর, তৃতীয় গ্রেডে ১৪ বছর, দ্বিতীয় গ্রেডে ১৭ বছর এবং প্রথম গ্রেডে ২০ বছর সন্তোষজনক চাকরিকাল পূর্ণ করলে এবং পদ শূন্য থাকলে পরবর্তী উচ্চতর স্কেলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপনীত হবেন।

ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের প্রথম শ্রেণীর এন্ট্রি পদ সমান হচ্ছে। অষ্টম পে স্কেলে ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর এন্ট্রি পদ অষ্টম গ্রেড ও নন ক্যাডার প্রথম শ্রেনীর এন্ট্রি পদ নবম গ্রেড রাখা হয়েছে। এখন উভয়েরই এন্ট্রি পদ অষ্টম গ্রেডে থাকবে।

গত ১৫ ডিসেম্বর অষ্টম বেতন কাঠামোর গেজেট জারি করে সরকার। কিন্তু নতুন পে স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিসিএস শিক্ষকদের বেতন আগের তুলনায় কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেছে বলে অভিযোগ ওঠে। বৈষম্যের অভিযোগ আনেন প্রকৌশলী, কৃষি ও চিকিৎসক (প্রকৃচি) এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ২৬টি ক্যাডার ও ফাংশনাল কর্মকর্তারা। একইভাবে ব্যাংক কর্মকর্তারাও ঘোষিত পে স্কেল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনও করেছেন। অসন্তোষ নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কোর কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। তারা কয়েক দফা প্রকৃচিসহ ২৬ ক্যাডারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দেওয়া হলে তারা আন্দোলন থেকে সরে যান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পরে তারা একটি প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাব বিবেচনা করে সমাধানের পথে এগোচ্ছে বলে সূত্র জানায়। ইতিমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যেসব ক্যাডারের প্রস্তাব এসেছে, তা পর্যালোচনা করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অষ্টম পে স্কেলে মূলত টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্যাডারদের পদোন্নতি নিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টরা বেতন বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন।
সূত্র:সমকাল

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর