রাজধানীর সড়ক নির্মাণে তুঘলকি কাণ্ড : ৩ বছরের প্রকল্প ১২ বছরে সম্পন্ন, ব্যয় বৃদ্ধি ১১৯ শতাংশ
রাজধানীর সড়ক নির্মাণে তুঘলকি কাণ্ড : ৩ বছরের প্রকল্প ১২ বছরে সম্পন্ন, ব্যয় বৃদ্ধি ১১৯ শতাংশ
২০১৬-০২-২৯ ০১:৩৬:৫০
প্রিন্টঅ-অ+


রাজধানীর ‘ডেমরা-আমুলিয়া-রামপুরা সড়ক নির্মাণ ও সায়েদাবাদ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পটি শুরু হয় ২০০৩ সালে। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের জুন মাসে। অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্প শেষ হয়েছে ১২ বছরে। ঘটনার এখানেই শেষ নয়, প্রকল্পের মূল বরাদ্দ ৪৮ কোটি টাকা থেকে দফায় দফায় বাড়িয়ে ১০৮ কোটিতে উন্নীত হয়। এ হিসাবে ব্যয় বেড়েছে ১১৯ শতাংশ। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ১২ বছরে এই প্রকল্পে ২৩ জন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই তথ্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি)। এ ধরনেরই আরেকটি প্রকল্প ‘মাঝিনা- কায়েতপাড়া-ত্রিমোহনী সংযোগ সড়ক’ নির্মাণ। প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় ২০০৪ সালে। নির্ধারিত তিন বছরের স্থলে শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের জুনে। ১১ বছরে এই প্রকল্পে ২২ জন পিডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর অধিকাংশ ছোট-বড় সড়ক নির্মাণ প্রকল্পেই এ ধরনের চিত্র রয়েছে। এতে প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন হয় না। সময় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়তে থাকে একই হারে। এ ধরনের প্রকল্পে নিুমানের কাজ অতি সাধারণ ঘটনা। এ কারণে একই প্রকল্প মেয়াদ শেষের আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এরপর চলে সংস্কারের নামে অর্থ লোপাট।

জানা গেছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যয় বৃদ্ধি ও অনিয়ম নিয়ে প্রায়ই তথ্য নির্ভর প্রতিবেদন দিয়ে থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা উপেক্ষা করছে। এ কারণে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডির সদ্য বিদায়ী সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, প্রতিবেদনগুলো সচিত্র। এজন্য এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত প্রতিবেদনগুলো আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া। এতে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা আরও বাড়বে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ডেমরা-আমুলিয়া-রামপুরা সড়ক নির্মাণ ও সায়েদাবাদ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে কাজ হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। এটুকু কাজ করতে ১২ বছর সময় লাগার পেছনে মূল কারণ প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে অর্থ স্বল্পতা। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকল্পের অধীনে যেসব কম্পোনেন্ট ছিল তা যথাযথভাবে করা হয়নি। নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই ভেঙে পড়ছে। এর অধীনে তিনটি ছোট ব্রিজ, ৩টি কালভার্ট ও ৩টি পাইপ কালভার্ট নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো অসম্পূর্ণ রেখেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার সড়ক রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে মানহীনভাবে।

আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই সময়ে আলোচ্য প্রকল্পে ২৩ জন ব্যক্তি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যেনতেনভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে মাত্র। দীর্ঘ সময়েও প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ইতি টানা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অর্জিত হয়নি।

ভবিষ্যতে সড়ক বিভাগের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি অনিয়ম পরিহারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

অন্যদিকে ‘মাঝিনা-কায়েতপাড়া-ত্রিমোহনী সংযোগ সড়ক’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০০৪ সালে। তিন বছরে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের জুনে। ১১ বছরে প্রকল্পের অধীনে ২২ জন ব্যক্তি পিডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অনুমোদনকালে ২৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বরাদ্দের পুরোপুরি ব্যয় করা যায়নি। এজন্য প্রকল্পের অধীনে যেসব কম্পোনেন্ট রাখা হয়েছিল তা শেষ না করেই প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গুণগত মানহীনভাবে কাজ করার ফলে নির্মিত সড়কের অ্যাপ্রোচ, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনডিউলেশন ও ক্র্যাক পেভমেন্টের কিনারা ভেঙে গেছে। এছাড়া এর অধীনে নির্মিত সেতুর রেলিং, ক্রস বর্ডার এবং কালভার্টে হানিকম (পিলারে ফাঁক) লক্ষ্য করা গেছে। যা রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত সংস্কার করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমির অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে। প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে আইএমইডির সুপারিশ সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হবে এবং সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র: যুগান্তর

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

ফিচার এর অারো খবর