আশুলিয়ায় কুপিয়ে পুলিশ হত্যা
আশুলিয়ায় কুপিয়ে পুলিশ হত্যা
২০১৫-১১-০৫ ১২:২৮:৪৪
প্রিন্টঅ-অ+


রাজধানীর গাবতলীতে তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের একজন এএসআই খুন হওয়ার ১৩ দিনের মাথায় বুধবার সকালে আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় খুন হলেন আরেক পুলিশ সদস্য। ওই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা এই হামলার জন্য জঙ্গিদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
হামলার শিকার পাঁচ পুলিশের কাছে পাঁচটি চায়নিজ রাইফেল ছিল।
গতকালের হামলায় নিহত পুলিশের নাম মুকুল হোসেন (২৫)। আর গুরুতর আহত হয়েছেন নূরে আলম সিদ্দিকী (২৬)। তাঁরা শিল্প পুলিশ-১-এ কর্মরত ছিলেন। নিহত মুকুলের মুখের বাঁ পাশে ও গলায় চাপাতির আঘাতের গভীর ক্ষত রয়েছে। তাঁর পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। মূলত গলার আঘাতে মুকুলের শ্বাসনালি কেটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। আহত নূরে আলমের বাঁ হাত ভেঙে গেছে। তাঁরও পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় অস্ত্রোপচারের পরে নূরে আলমকে এনাম হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই হামলাকারীর ছুরি-চাপাতির মুখে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারেননি সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা। অথচ পাঁচজনের হাতে পাঁচটি চায়নিজ রাইফেল ছিল। তারপরও কেউ গুলি ছোড়েননি। দুই কনস্টেবল হামলার শিকার হওয়ার পরে সেখানে উপস্থিত অন্য তিনজন শালবনের দিকে দৌড় দেন। এঁরা হলেন কনস্টেবল ইমরান আজিজ, আপেল মাহমুদ ও পিনারুজ্জামান। তবে হামলাকারীদের কাছেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। সেটি দিয়ে তারা কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছুড়েছে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

|ঘটনার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাভারের এনাম হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গি ও মানবতাবিরোধীদের বিচার চলছে। রায় কার্যকর হওয়ারও সময় কাছে এসেছে। এগুলোকে নস্যাৎ করার পাশাপাশি দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে এ ধরনের নাশকতা শুরু হয়েছে। সশস্ত্র অবস্থায় থাকার পরও পুলিশ সদস্যদের কোনো প্রতিরোধ না করতে পারার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত ছাড়া এ বিষয়ে আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না।
এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানার এসআই হাবিবুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ওসি মহসিন কাদির বলেছেন, গতকালের হামলার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বা কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল চার লেনের মহাসড়কের বাড়ইপাড়ায় নন্দন পার্কের উল্টো দিকের ওই তল্লাশিচৌকিতে দুই পালায় ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ সদস্যরা মোতায়েন থাকেন। আশুলিয়া থানার ওই চৌকিতে ফোর্স সরবরাহ করে থাকে শিল্প পুলিশ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানায়, গতকাল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে পাঁচজন পুলিশ কনস্টেবলকে নন্দন পার্কের সামনে নামিয়ে দিয়ে পুলিশের গাড়িটি চন্দ্রার দিকে চলে যায়। পুলিশ সদস্যরা রাস্তা পার হয়ে নন্দনের উল্টো দিকে পরপর ছয়টি ঝুপড়ি খাবার হোটেলের একটিতে গিয়ে বসেন। সেই রেস্তোরাঁটি তখন কেবল খুলেছে। মালিকের অনুরোধে পুলিশ সদস্যদের তিনজন পাশের বন্ধ ঝুপড়ি দোকানটিতে গিয়ে বসেন। অন্য দুই সদস্য অনতিদূরেই কোথাও ছিলেন। এ সময় নবীনগরের দিক থেকে উল্টো পথে একটি মোটরসাইকেল এসে সারি সারি হোটেলগুলোর কোনায় মহাসড়কের ওপর থামে। এ সময় মোটরসাইকেল থেকে দুই ব্যক্তি নেমে পুলিশ সদস্যরা যে হোটেলটিতে বসে ছিলেন, সেখানে ঢুকে সালাম দিয়ে সম্ভাষণ জানান। এরপর তাঁদের কোনো আত্মীয় পুলিশে চাকরি করেন, তা নিয়ে আলাপ শুরু করেন। এর মধ্যেই ওই মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি ছোরা-চাপাতি হাতে নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই পুলিশ সদস্যকে আঘাত করেন। হামলাকারীদের একজন আগ্নেয়াস্ত্র বের করে কয়েকটি ফাঁকা গুলিও ছোড়েন। চাপাতি-ছুরিকাঘাতে আহত কনস্টেবল মুকুল হোসেন ওই দোকান থেকে বেরিয়ে পাশের শুভেচ্ছা ভাতের হোটেলে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়েন। হাতে ও পেটে চাপাতির আঘাত নিয়ে কনস্টেবল নূরে আলম রাস্তা পার হয়ে নন্দন পার্কের দিকে দৌড় দেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা অপর তিন কনস্টেবল প্রতিরোধে এগিয়ে না এসে পেছনের শালবনের ভেতরে দৌড় দেন। গুলির শব্দে নন্দন পার্কের খোলা জায়গায় রাখা বাসের কর্মীরা ও কারখানামুখী শ্রমিকেরা এগিয়ে এসে দুই মোটরসাইকেল আরোহীকে চন্দ্রার দিকে পালিয়ে যেতে দেখেন। পরে লোকজন আহত দুজনকে তুলে হাসপাতালে পাঠালে কনস্টেবল মুকুলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিত্সকেরা।
ঘটনার পরপর সেখানে উপস্থিত হওয়া বিআরটিসি বাসের চালক কনক দাস প্রথম আলোকে বলেন, কনস্টেবল নূরে আলমকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাল বেয়ে নামতে দেখে তিনি ছুটে এসে তাঁকে ধরেন। ঢালের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে কনক দেখেন মহাসড়ক দিয়ে একটি মোটরসাইকেলে দুজন দ্রুতবেগে বাইপাইলের দিকে চলে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের চালক-আরোহীদের মাথায় হেলমেট ছিল না। তবে ঢাল থেকে তাদের মুখ দেখা যায়নি।
পুলিশ হত্যার খবর পেয়ে আশুলিয়া থানার পুলিশ, শিল্প পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনীর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডি ও পিবিআইয়ের দল। হোটেলের ভেতর থেকে ব্যবহৃত দুটি গুলির খোসা উদ্ধার হয়েছে।
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে যান। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, ধরন দেখে মনে হয়েছে হত্যার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি দল তদন্তে নেমেছে। ওই ঘটনার পরে দেশে পুলিশের সব চৌকি আরও শক্তিশালী করা হবে বলে তিনি জানান।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, এরপর দুর্বৃত্তরা আর এ রকম হামলা চালানোর সুযোগ পাবে না।
মাত্র ১৩ দিন আগে গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীতে এক ব্যক্তির ব্যাগ তল্লাশির সময় দারুস সালাম থানার এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে ছুরি মেরে খুন করা হয়। পুলিশ তখন বলেছিল, ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাতকারী বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। ওই ঘটনার পর পুলিশ ঢাকা ও বগুড়া থেকে ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। তাঁদের কাছ থেকে পাঁচটি হাতে তৈরি গ্রেনেডও উদ্ধার করা হয়। ওই একই রকম গ্রেনেড দিয়েই গত ২৩ অক্টোবর রাতে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে হামলা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই চক্রটির আরও বড় নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর সারা দেশেই পুলিশকে আরও সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে বলে পুলিশ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলে আসছেন। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের একটি টহল গাড়িতে দুর্বৃত্তরা গুলি চালালে গাড়িটি খাদে পড়ে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার গভীর রাতে মাদক ও অস্ত্র বহনকারী একটি গাড়িকে ধাওয়া করার পর ওই গাড়ি থেকে টহল ভ্যানে গুলি করায় সেটি খাদে পড়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই গতকাল সকালে আশুলিয়ায় ঢাকা-টাঙ্গাইল (নবীনগর-চন্দ্রা) মহাসড়কের পাশে কর্তব্যরত পুলিশের ওপর আরেকটি হামলা হলো।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, মনে হচ্ছে, নিরাপত্তা চৌকিতে যতটা সতর্কতা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটুকু নেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলোজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জিয়া রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সমাজ পরিবর্তনের কারণে অপরাধের ধরনে যে পরিবর্তন হয়েছে সে তুলনায় পুলিশের সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। ফলে এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশকে মাঝেমধ্যে হোঁচট খেতে হচ্ছে।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়ায় কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি করতে গিয়ে আটজনকে খুন করে জঙ্গিরা। গণপিটুনিতে ওই ঘটনায় ডাকাতের মৃত্যু হয়। ঢাকা জেলা পুলিশ ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ১০ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে।

ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর প্রকাশিত প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, রেখাচিত্র, ভিডিও, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট অাইনে পু্র্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবেনা ।

মন্তব্য

মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ইঞ্জিনিয়রবিডি ডটকম-এর কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো দায় নেবে না।

স্বদেশ এর অারো খবর